ভোটাধিকার হরণের কলঙ্কিত অধ্যায়: দায়মুক্তির সুযোগ নেই
বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে যেভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে তার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয় বরং শিউরে ওঠার মতো। সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে যে, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সুপরিকল্পিত ‘ভোট ডাকাতি’। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত নির্বাচনকে ব্যবহার করে খোদ জনগণের ওপরই ‘শাস্তি’ চাপিয়ে দেওয়ার এই নির্লজ্জ ইতিহাস জাতির জন্য অত্যন্ত অপমানের।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রহসন থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি প্রার্থী’র নাটক—সবই ছিল একই সূত্রের গাঁথা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে প্রশাসন, পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মূলত আমলাতন্ত্রের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছিল।
যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় অশনিসংকেত আর হতে পারে না। যখন কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে জালিয়াতির মাত্রা কতটা বেপরোয়া পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস যথার্থই বলেছেন, এই ভোট ডাকাতির পুরো রেকর্ড জাতির সামনে থাকা দরকার। আমরা মনে করি, কেবল তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশই যথেষ্ট নয়; বরং এই দীর্ঘমেয়াদী অপরাধের সাথে যারা সরাসরি জড়িত ছিল—চাই তারা রাজনৈতিক নেতা হোন কিংবা অতি-উৎসাহী আমলা—তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
যারা জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তাদের বিচার না হলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরণের অপতৎপরতার পথ খোলা থেকে যাবে।
নির্বাচন ব্যবস্থাকে সংস্কার করে এমন একটি স্থায়ী ও মজবুত কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে আর কোনো দিন কোনো শক্তির পক্ষে জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো সম্ভব না হয়। একটি ‘নির্বাচন সেল’ গঠন করে যেভাবে সমান্তরাল প্রশাসন চালানো হয়েছে, সেই ছিদ্রপথগুলো চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
আমরা আশা করি, এই তদন্ত প্রতিবেদন কেবল নথিবদ্ধ দলিল হিসেবে থেকে যাবে না, বরং এটি হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ভোটাধিকার ফেরত পাওয়া এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা অর্জনই হোক এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। নতুবা ইতিহাসের এই কলঙ্ক তিলক থেকে জাতির মুক্তি মিলবে না।