
জ্বালানি নয়, যেন বিষের ছোঁয়া; এলপি গ্যাসের দামে পুড়ছে সাধারণ মানুষের পকেট।
কাঠগড়া বাজারে এলপিজি সিন্ডিকেটের ‘মগের মুল্লুক’: সরকারি দাম স্রেফ কাগজে, পকেট কাটছে একদল লুটেরা
অনুসন্ধান: মোঃ নুর আলম | প্রতিবেদক: কালের পরিবর্তন
তারিখ: ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ | স্থান: কাঠগড়া বাজার,
আশুলিয়া।
সাভার-আশুলিয়া থেকে: সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি! কল্পনা নয়, এটিই এখন সাভার ও আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারের নিত্যদিনের চিত্র। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) যেখানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩৫৩ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেখানে এই বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায়। কোনো রশিদ নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই—আছে শুধু সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক নিষ্ঠুর মহোৎসব।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা চাঞ্চল্যকর চিত্র:
সরেজমিনে কাঠগড়া বাজারের একাধিক ডিলার ও খুচরা দোকান ঘুরে দেখা গেছে, প্রকাশ্যেই চলছে এই ‘মূল্যসন্ত্রাস’। বিক্রেতাদের চোখেমুখে নেই কোনো আইনি ভয়। অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে অজুহাতের ঝুলি খুলে বসেন তারা।
অনুসন্ধানে যা দেখা গেছে:
রসিদবিহীন বাণিজ্য: অতিরিক্ত টাকা নিলেও কোনো বিক্রেতা বৈধ মানি রসিদ দিচ্ছেন না।
ডিলারদের দাপট: খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ওপর মহলের সিন্ডিকেট এবং ডিলারদের বেঁধে দেওয়া দামের কারণেই তারা বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃত্রিম সংকট: অনেক সময় দোকানে গ্যাস থাকা সত্ত্বেও ‘স্টক নেই’ বলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম আরও বাড়ানো হচ্ছে।
একজন বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা তো ছোট মাছ, বড় রাঘববোয়ালরা দাম ঠিক করে দেয়। আমরা না নিলে অন্য দোকান নেবে, আমাদের করার কিছু নেই।”
প্রশাসনের নীরবতা ও সাধারণের হাহাকার
কাঠগড়া ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে হাজার হাজার শ্রমিক ও নিম্নআয়ের পরিবার বসবাস করে। পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় তারা পুরোপুরি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই আকাশচুম্বী দাম মেটাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এক ভুক্তভোগী গৃহিণী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার টিভির পর্দায় দাম কমায়, কিন্তু আমাদের বাজারের দোকানদাররা সেই খবর মানে না। আমাদের রক্ত জল করা টাকা দিয়ে তাদের পকেট ভরছি।”
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, দিনের পর দিন এই অরাজকতা চললেও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো বিশেষ অভিযান বা তদারকি এই এলাকায় দেখা যায়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এই নীরবতা সিন্ডিকেটকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন:
এই অনুসন্ধান শেষে জনমনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে:
১. বিইআরসি’র নির্ধারিত দাম কি তবে শুধুই লোক দেখানো?
২. প্রশাসনের নাকের ডগায় এই হাজার কোটি টাকার লুটপাট কার ইশারায় চলছে?
৩. সাধারণ ভোক্তাকে এই জিম্মি দশা থেকে মুক্তি দেবে কে?
জরুরি দাবি:
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে কাঠগড়া বাজারে টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালনা করতে হবে। যারা সরকার অমান্য করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। নচেৎ, এলপি গ্যাসের এই আগুন দামে পুড়তে থাকবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস আর রাষ্ট্রের সুশাসন।