
টেকনাফে রোহিঙ্গা ডাকাত নুর কামাল নিহতের ঘটনায়
স্থানীয়দের মিথ্যা মামলায় জড়ানোর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন
টেকনাফ প্রতিনিধি
টেকনাফের মুচনী রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শীর্ষ ডাকাত নুর কামাল নিহতের ঘটনায় স্থানীয় নিরীহ লোকজনকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে হত্যা মামলায় জড়ানোর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে টেকনাফ উপজেলার লেদা নুর আলী পাড়া বাজার এলাকায় ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে আব্দুল খালেক ও আব্দুর রহমানের মা ফাতেমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘটনার দিন তার দুই ছেলে এলাকায় উপস্থিত ছিলেন না। আব্দুল খালেক তখন চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন এবং আব্দুর রহমান একটি ইটভাটায় কর্মরত ছিলেন। অথচ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাদের হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় নুর আলীর ছেলে হোছন ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে তার ছেলেদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর আগেও তার ছোট ছেলেকে অস্ত্র দিয়ে সাজিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তিনি মিথ্যা মামলা থেকে তার সন্তানদের রেহাই দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ সময় আব্দুর রহমানের স্ত্রী কহিনুর বেগম ও আব্দুল খালেকের স্ত্রী নুর ফাতেমা অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় হোছনের কারণে তাদের স্বামীরা একের পর এক মিথ্যা মামলার শিকার হচ্ছেন। তারা রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে ডাকাত নিহতের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলা থেকে তাদের স্বামীদের নাম প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে হাশেম উল্লাহর মা রেহেনা বেগম ও নুর হাসানের মা তৈয়বা বেগম তাদের সন্তানদের নির্দোষ দাবি করে বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এভাবে স্থানীয়দের হয়রানি করা অনাকাঙ্ক্ষিত। তারা মামলার সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তের আহ্বান জানান।
হত্যা মামলার ২ নম্বর আসামি জিয়াউর রহমান নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবাস জীবন কাটিয়ে দুই বছর আগে দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন। এর আগেও একটি মিথ্যা মামলায় আড়াই বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি মুক্তি পান। মুক্তির পরপরই তাকে এই হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভুক্তভোগী জিয়াউর রহমানের স্ত্রী নুর বেগম বলেন, নিহত নুর কামাল ক্যাম্পে একজন ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে পরিচিত ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, নুর কামাল ক্যাম্পে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালাত। নুর কামালের হাতে অস্ত্রের আঘাতে তিনি নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
আব্দুল খালেক বলেন, রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে ডাকাতদের অভ্যন্তরীণ গোলাগুলিতেই নুর কামাল নিহত হয়েছেন। অথচ স্থানীয় আত্মস্বীকৃত ইয়াবা ব্যবসায়ী হোছন ও অস্ত্র ব্যবসায়ী মুখতার অর্থের বিনিময়ে নিরীহ লোকজনকে হত্যা মামলায় জড়িয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
দক্ষিণ লেদা বায়তুন নুর জামে মসজিদের খতিব ও ওলামা বিভাগের সেক্রেটারি মাওলানা আবুল হাশেম বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে সংঘটিত অপরাধে স্থানীয়দের জড়ানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি এই মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এদিকে একটি ইটভাটার ম্যানেজার আবুল আসাদ জানান, নিহত নুর কামাল কখনোই তাদের ইটভাটায় শ্রমিক বা কোনো পদে কর্মরত ছিলেন না। যে ভাড়া বাসার কথা বলা হচ্ছে সেটি ইটভাটার মালিক নুরুল কবিরের এবং সেখানে নুর কামাল কখনো বসবাস করেননি বলেও তিনি দাবি করেন।
উল্লেখ্য, গত ৯ জানুয়ারি মুচনী রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডাকাত দলের অভ্যন্তরীণ গোলাগুলিতে শীর্ষ ডাকাত নুর কামাল নিহত হন। ঘটনার পাঁচ দিন পর ১৩ জানুয়ারি নিহতের মা হামিদা বেগম বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় স্থানীয়দেরসহ ১০ জনকে নামীয় ও ৪–৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে টেকনাফ মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আজিজুল হাকিমকে।