
নওগাঁয় নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত: তদন্ত কমিটি গঠন, সহকারী স্টেশন মাস্টার বরখাস্ত
ভোগান্তিতে শত শত যাত্রী; উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার রেলযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক নওগাঁ | ১৮ মার্চ, ২০২৬
বগুড়ার সান্তাহার জংশন স্টেশনের অদূরে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী ট্রেন ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ লাইনচ্যুত হয়েছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে বহু যাত্রী আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর থেকে ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেলযোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, ফলে বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়া যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার দায়ে সান্তাহারের সহকারী স্টেশন মাস্টার শহিদুল ইসলাম রঞ্জুকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুর ২টার দিকে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সান্তাহার জংশন স্টেশনের সংলগ্ন বাগবাড়ী দক্ষিণপাড়া এলাকায় পৌঁছালে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে কর্মচারীরা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল। রেললাইন ভেঙে যাওয়ার কারণে খালাসীরা কাজ করছিলেন এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রায় হাফ কিলোমিটার দূরে উভয় পাশে লাল পতাকা ও লাল ব্যানার টানানো ছিল। এছাড়া কন্ট্রোল রুমেও সিগন্যাল দেওয়া ছিল।
কিন্তু ট্রেনচালক সেই লাল ব্যানার, রেলওয়ের সিগন্যাল এবং কর্মচারীদের হাতের সংকেত উপেক্ষা করে গতি না কমিয়েই ঘটনাস্থলে চলে আসেন। এর ফলে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে ৯টি বগি ছিটকে পড়ে। দুর্ঘটনার পর থেকেই ট্রেনের চালক পলাতক রয়েছেন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ট্রেনের ভেতরে আটকে পড়া এবং ছাদের ওপর থেকে পড়ে যাওয়া বিপুল সংখ্যক যাত্রী আহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস এখন পর্যন্ত ৬২ জন যাত্রীকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছে। নওগাঁ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডাক্তার আবু জার গাফফার জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে ২০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ জনের হাত-পা সহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এছাড়া আরও ৪০ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন।
আহতদের আদমদীঘি ও নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ট্রেনের ছাদে থাকা অনেক যাত্রী পড়ে গিয়ে হতাহত হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রেলওয়ে থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয়রা মিলে এখনও উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। সান্তাহার রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার পর থেকে সান্তাহার রুটে ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেলযোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্টেশনে একাধিক ট্রেন আটকে পড়ায় শত শত যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। দ্রুত লাইন সচল করার জন্য উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে।
সান্তাহার জংশন স্টেশনের মাস্টার খাদিজা খাতুন মুঠোফোনে দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, তবে সহকারী স্টেশন মাস্টার শহিদুল ইসলাম রঞ্জুকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। দ্রুত উদ্ধার কাজ শেষ করে রেলযোগাযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।’
সান্তাহার রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাবিবুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে লাইন সচল করার কাজ চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।