
ঈদুল আজহায় চিরচেনা রূপে সদরঘাট : পদ্মা সেতুর ধাক্কা সামলে মুখরিত নৌপথ
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এক সময়ের জমজমাট ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাট যেন তার পুরনো জৌলুস হারিয়ে ফেলেছিল। দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত এই ঘাট হয়ে পড়েছিল অনেকটাই নিথর ও শান্ত। তবে সব নিস্তব্ধতা ভেঙে এবারের ঈদুল আজহায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য দেখা গেল সদরঘাটে। চিরচেনা সেই উপচেপড়া ভিড়, চিরন্তন কোলাহল আর লঞ্চের সাইরেন জানান দিচ্ছে—বাঙালির নদীপ্রেম এবং লঞ্চ যাত্রার ঐতিহ্য কখনো মরে যাওয়ার নয়।
মে মাসের এই ঝড়-তুফানের মৌসুমের মাঝেই সদরঘাট টার্মিনালে নেমেছে ঘরমুখো মানুষের ঢল। গত কয়েক বছরের সুনসান নীরবতার বুক চিরে আজ সদরঘাট সেজেছে তার পুরোনো জাঁকজমকপূর্ণ সাজে। সড়ক পথের আধুনিক ডামাডোল এবং পদ্মা সেতুর তুমুল জনপ্রিয়তার মাঝেও নদীর আদিম টান যে এখনো কতখানি জীবন্ত, সদরঘাটের বর্তমান চিত্রই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
টার্মিনালে পা রাখতেই চোখে পড়ে ঢাকা ছড়া লাখো মানুষের অভূতপূর্ব ব্যস্ততা। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি আর পিরোজপুরের মতো দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষেরা যেমন লঞ্চের কেবিন ও আসন নিশ্চিত করতে মরিয়া, তেমনি মুন্সিগঞ্জ বা চাঁদপুরের স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরাও এই উৎসবের স্রোতে শামিল হয়েছেন। একের পর এক বিশাল আকৃতির লঞ্চ যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে ঘাট ছেড়ে যাচ্ছে, আর বুড়িগঙ্গার বক্ষে তৈরি হচ্ছে আনন্দের ঢেউ।
ঘাটজুড়ে দেখা যাচ্ছে আবেগঘন পারিবারিক কোলাজ। দূরপাল্লার যাত্রীরা অনেক আগে থেকেই ব্যাগ-পত্র নিয়ে নদীর তীরে এসে অপেক্ষা করছেন। কেউ কাউন্টারে গিয়ে টিকিটের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছেন, কেউ বা শান্ত হয়ে বসে আছেন নিজের প্রিয় লঞ্চটির প্রতীক্ষায়।
লঞ্চে যাতায়াতকারী ঘরমুখো যাত্রীরা জানান, সড়ক পথের চেয়ে লঞ্চ যাত্রা অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক এবং আরামদায়ক। বাসের মতো যানবাহনে যাদের যাতায়াতে শারীরিক সমস্যা হয়, তাদের জন্য লঞ্চই একমাত্র ভরসা। তাছাড়া পরিবার নিয়ে একটু নিরিবিলিতে এবং কম দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে বাড়ি ফেরার জন্য এখনো লঞ্চের বিকল্প নেই।
তবে আনন্দের এই উৎসবের মাঝেও রয়েছে সতর্কতার বার্তা। গত ঈদুল আজহাতেও সদরঘাটে একটি নির্মম দুর্ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছিল সবাইকে। তাই এবারও সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে মে মাসের এই ঝড়-বাদলের দিনে আবহাওয়া দপ্তরের দেওয়া নির্দেশিকার প্রতি কড়া নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।
শেষ মুহূর্তে ঘরমুখো এই বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে ঘাট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। তাদের চৌকস দল সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সেই সাথে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং নৌবন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি রাখছেন।