
খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: আবেগ ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় এবারই প্রথম দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী এই নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পাশাপাশি বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবদান, সংগ্রাম ও নেতৃত্বকে বিশেষভাবে স্মরণ করছে বিএনপি।
রাজনীতিতে আগমন ও ‘আপসহীন’ নেতৃত্ব
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। পাঁচ দশকের পথচলায় দলটি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, বিরোধী দলে থেকেছে এবং নানা রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছে। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল প্রায় ৪৩ বছরের। ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু এই দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং অর্জন করেন ‘আপসহীন নেত্রী’র উপাধি। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন। পরে তাঁর সরকারের আমলেই দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলেও তিনি ছিলেন দলের কেন্দ্রে। ২০০১ সালে পুনরায় সরকারপ্রধান হয়ে তিনি যেমন রাষ্ট্রক্ষমতায় অবস্থান শক্ত করেন, তেমনই বিস্তৃত করেন দলীয় সংগঠন।
সাফল্যের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা বিতর্ক ও কঠিন সংকটে পূর্ণ। ২০০৭ সালের পর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, কারাবাস ও মামলার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। ২০১৮ সালে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ে। তবে বিএনপি শুরু থেকেই এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার অবর্তমানে বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন দলের ঐক্যের প্রধান প্রতীক। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়কে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং খালেদা জিয়ার সংগ্রাম—এই দুই উত্তরাধিকারকে ধারণ করে ভবিষ্যতের পথচলার বার্তা দেওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে।
খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পথেই বিএনপির পথচলা। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, জাতীয়তাবাদ থাকবে, তত দিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’