
গাইবান্ধায় নদের পানি বৃদ্ধি, ২৫ পয়েন্টে তীব্র ভাঙনে নদীগর্ভে ২০০ বাড়ি
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাইবান্ধা
গাইবান্ধায় তিস্তা, করতোয়া ও ঘাঘট নদের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কিছুটা কমেছে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। জেলাটিতে প্রবাহমান সবকটি নদ-নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি ওঠা-নামার কারণে তীরবর্তী ২৫টি পয়েন্টে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ২০০ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং ভাঙন আতঙ্কে আরও শতাধিক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সন্ধ্যা ৬টার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি ৩০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে করতোয়া নদীর পানি ১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩৯১ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদের পানি ১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৬৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৯ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাউবো জানিয়েছে, চলমান বন্যার মৌসুমে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধার কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
এদিকে, মাসখানেক ধরে জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি কখনো বাড়ছে, আবার কখনো কমছে। আর এই পানি ওঠা-নামার সঙ্গে নদী তীরবর্তী এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ রসুলপুর গ্রামে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙনে নদী তীরবর্তী বসতভিটা, গাছপালা, বাঁশঝাড় ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। অনেকেই ঘরবাড়ি সরিয়ে অন্য স্থানে নিচ্ছেন।
শুধু দক্ষিণ রসুলপুরই নয়, ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের চৌমহন চর, খাটিয়ামারি, দক্ষিণ খাটিয়ামারি ও কাউয়াবাদা, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার লালচামার ও কেরানীর চর, কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ি এবং সদর ও সাঘাটা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এসব এলাকার ভাঙন না থামায় চরম বিপাকে পড়েছেন নদী পাড়ের মানুষ।
দক্ষিণ রসুলপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে এখানে তীব্র ভাঙন চলছে। ভাঙনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, গাছ-গাছালি ও বাঁশঝাড় সবকিছু নদীতে নিমিষেই তলিয়ে গেছে। সেইসঙ্গে এলাকার প্রায় ৩০ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনের খবরে জেলার সংশ্লিষ্ট ও শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গেলেও কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকছে সবকিছু। ফলে চাপা ক্ষোভ, আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটছে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের।
রসুলপুর গ্রামের জমিরন বেগম (৬০) বলেন, “ভাঙনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, গাছ-গাছালি বাঁশঝাড় নদীতে তলিয়ে গেছে। শেষ সম্বল শুধু বাড়ি-ঘর; ওটুকু ভেঙে গেলে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে।” একই এলাকার কৃষক আলম মিয়া (৫৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সবাই আসে শুধু আশ্বাস দেয়। কিন্তু কাজ করে না। ভাঙন না ঠেকালে আমরা একবারে নিঃস্ব হয়ে যাবো।” ১০ শতক জমি হারানো আনোয়ারা বেওয়া আক্ষেপ করে প্রশ্ন তোলেন, “বাকিটুকু ভাঙলে কোথায় থাকব, কে দেখবে আমাদের?”
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্ষার চলমান মৌসুমে জেলার প্রায় ৯০০ বিঘা জমির ফসল পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। এসব আক্রান্ত ফসলের বেশিরভাগই ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়।
এ বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা ভাঙন কবলিত স্থানগুলো পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এবং ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, “ভাঙন ঠেকাতে ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১২টি পয়েন্টে জরুরি কাজ চলছে। অন্য পয়েন্টগুলোতেও দ্রুতই কাজ শুরু করার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।”